বাংলাস্ফিয়ারঃ কলকাতা ও হাওড়ার আসন্ন পুরভোটে তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলরদের বিজেপির টিকিটে লড়ার জল্পনায় আপাতত জল ঢাললেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর তিনি জানান, প্রার্থী কারা হবেন, সেই সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। ফলে নির্দিষ্ট কয়েকজন তৃণমূলত্যাগীর মনোনয়ন নিশ্চিত ধরে নেওয়ার ভিত্তি নেই। তবে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্যে ভবিষ্যতে এমন সম্ভাবনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

সাংবাদিকেরা কয়েকজন প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলরের নাম তুলে প্রশ্ন করলে শমীক তাঁদের বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান। প্রার্থিতালিকা নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য এড়িয়ে তাঁর বক্তব্য, কাকে কোথায় দাঁড় করানো হবে, তা দল এখনও স্থির করেনি। সুকান্তও জানিয়েছেন, পুরভোটে সম্ভাব্য কোনও শরিকের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির আলোচনা হয়নি। বিধানসভায় বিজেপি একাই লড়ে বড় জনসমর্থন পেয়েছিল বলে মনে করিয়ে দেন তিনি।

সল্টলেকে বিজেপির দফতরে দু’দিনের নির্বাচনী বৈঠকের প্রথম দিনের পরে এই মন্তব্য করেন শমীক। বৈঠকে ছিলেন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল। কলকাতার ২০৯টি এবং হাওড়ার ৬৮টি আসনেই লড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের নেতারা শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বদলে বিজেপিতে আসবেন, সেই উদ্দেশ্যে বাংলার মানুষ সরকার পরিবর্তন করেননি—এমনই বার্তা দেন রাজ্য সভাপতি।

তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলরদের আবেদন প্রসঙ্গে শমীক জানান, তাঁর কাছে এমন কোনও তথ্য নেই এবং দলে সেই ধরনের আবেদনও জমা পড়েনি। সুকান্ত অবশ্য বিষয়টিকে আরও নমনীয়ভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, রাজনীতিতে সব ক্ষেত্রে বাঁধাধরা নিয়ম চলে না; বিভিন্ন সমীকরণ বিবেচনায় নিতে হয়। চূড়ান্ত প্রার্থিতালিকা প্রকাশের পরেই অবস্থান পরিষ্কার হবে। জয়ের সম্ভাবনা, জনমানসে ভাবমূর্তি এবং অভিজ্ঞতাকে প্রার্থী বাছাইয়ের মাপকাঠি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

এই জল্পনাকে হাতিয়ার করে বিজেপিকে কটাক্ষ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। এনসিপিআই নেতাদের প্রার্থী করার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তাঁর দাবি, তেমন হলে বোঝা যাবে বিজেপির নিজের পর্যাপ্ত প্রার্থী নেই। অর্থাৎ তৃণমূলত্যাগীদের সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘিরে বিতর্ককে শাসকদলের সাংগঠনিক শক্তির প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে দিতে চাইছে বিরোধী শিবির।

বিতর্কের পটভূমিতে রয়েছে বিধানসভা নির্বাচনের পরে তৃণমূলের ভাঙন। দলের ২০ জন সাংসদ এনসিপিআইয়ে যোগ দিয়ে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থন জানান। সেই সম্পর্কের সূত্রে পুরভোটেও সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। কিন্তু রাজ্য বিজেপি আগেই জানিয়েছিল, জাতীয় স্তরের বোঝাপড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলার স্থানীয় নির্বাচনে জোটের ভিত্তি হবে না।

সেপ্টেম্বরে বিজেপির নেতারা নিজেদের সংগঠন ও কর্মীদের উপর নির্ভর করে পুরভোটে লড়ার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, দীর্ঘদিন যাঁদের বিরুদ্ধে কর্মীরা রাজনৈতিক লড়াই করেছেন, তাঁদের সঙ্গেই হাত মেলালে বিভ্রান্তির বার্তা যেতে পারে। একই সঙ্গে পুরপরিষেবার উন্নতি এবং দুর্নীতির অভিযোগকে নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে রাখার পরিকল্পনাও জানিয়েছিল দল। প্রচারের ক্ষেত্রে রাস্তা, নিকাশি, পানীয় জল এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উল্লেখও ছিল।

অক্টোবরের গোড়াতেও শমীক বলেছিলেন, অন্য দল থেকে নেতা এলেও বিজেপির সাংগঠনিক চরিত্র বদলাতে দেওয়া হবে না। রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে যোগদান এবং ক্ষমতার সুবিধা নিতে দলে আসার মধ্যে পার্থক্য করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। দলের নিজস্ব কর্মীও শৃঙ্খলা ভাঙলে বা অসামাজিক কাজে যুক্ত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন রাজ্য সভাপতি।

অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুরসভাতেও বিজেপিকে জেতানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে কেন্দ্র, রাজ্য ও পুর প্রশাসনে একই দলের সরকার থাকে। প্রার্থী বাছাই এবং দুই শহরের নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে তিনি দিল্লিতেও আলোচনা করেছেন। ফলে দলবদলুদের সম্ভাব্য মনোনয়ন নিয়ে নেতৃত্বের প্রতিটি বক্তব্য এখন পুরভোটের প্রস্তুতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

আপাতত স্পষ্ট, তৃণমূলত্যাগীদের টিকিট দেওয়ার কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা হয়নি। আবার সুকান্তের বক্তব্যকে তাঁদের জন্য সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাও বলা যাচ্ছে না। কে বিজেপির প্রতীকে লড়বেন এবং কোনও নির্বাচনী সমঝোতা হবে কি না, তার নির্দিষ্ট উত্তর মিলবে দল আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানালে।